728x90 AdSpace

Latest News

Wednesday, 7 November 2018

পূর্ব বর্ধমান জেলা পরিষদের সিলমোহর ব্যবহার করে মেয়াদ উর্তীর্ণ টোল চালানোর অভিযোগ, আলোড়ন


ফোকাস বেঙ্গল ডেস্ক,বর্ধমানঃ পূর্ব বর্ধমানের দেওয়ানদিঘী থানার পালিতপুরে বেহাল রাস্তা থেকে পাথর ছিটকে এক কিশোরের বুকে লাগায় তার মৃত্যুর পর শুরু হয়েছিল ব্যাপক বিক্ষোভ। গত শনিবার এই ঘটনার পর বর্ধমান-কাটোয়া রোডের পালিতপুর মোড় থেকে সিউড়ি রোড পর্যন্ত প্রায় ৬ কিমি রাস্তার জন্য বর্ধমান জেলা পরিষদের নামে যে টোল আদায় করা হয়েছে এতাবত্কাল, তা নিয়েই এবার সরব হলেন গ্রামবাসীরা।

বর্ধমান সদর ১নং ব্লকের বর্ধমান-কাটোয়া রোডের পালিতপুর থেকে এই লিংক রোডটি গিয়ে মিশেছে এনএইচ ২বি তথা বর্ধমান সিউড়ি রোডে। এতদিন ধরে প্রধানমন্ত্রী সড়ক যোজনা খাতে তৈরী হওয়া এই রাস্তাটি ছিল পূর্ব বর্ধমান জেলা পরিষদের অধীনেই। এই রাস্তার ওপর নির্ভরশীল পালিতপুর ছাড়াও বীরপুর, সিজেপাড়া সহ প্রায় গোটা দশেক গ্রামের মানুষ। এই রাস্তাকে ঘিরেই তৈরী হয়েছে বেশ কয়েকটি স্পঞ্জ আয়রণ কারখানা সহ বড় শিল্পও। ফলে এই রাস্তা দিয়েই প্রতিদিন শয়ে শয়ে বিশেষ করে পণ্যবাহী ট্রাক যাতায়াত করে। একইসঙ্গে বর্ধমান শহরের যানজট মোকাবিলায় কাটোয়া থেকে গলসীগামী গাড়িগুলিকেও এই পথেই সিউড়ি রোড হয়ে ২নং জাতীয় সড়ক দিয়ে পার করে দেওয়া হয়। স্বাভাবিকভাবেই গ্রামবাসীদের অভিযোগ, প্রচুর পরিমাণে এই রাস্তা দিয়ে ভারী গাড়ি যাওয়ায় রাস্তার হাল খারাপ হয়েছে। ভারী পণ্যবাহী গাড়ি যাওয়ায় গোটা রাস্তা খানাখন্দে ভর্তি হয়েই থাকে। ফলে সাধারণ পথচারীদের বিপদের মুখে পড়তে হয়।

গত ১ অক্টোবর এই কারণেই রাস্তার পাথর ছিটকে এসে বুকে লাগায় ভাস্কর ঘড়ুই নামে ১২ বছরের একটি কিশোরের মৃত্যু হয়। এই ঘটনাকে ঘিরে ৩ অক্টোবর এই কিশোরের মৃতদেহ রাস্তায় নামিয়ে রেখে ব্যাপক বিক্ষোভে ফেটে পড়েন গ্রামের মানুষ। এই লিংক রোড কেটেও দেওয়া হয়। গ্রামবাসীরা অভিযোগ তোলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই রাস্তা খারাপ। বারবার জেলা প্রশাসনকে জানিয়েও কোনো সুরাহা হয়নি। অথচ এই পালিতপুর মোড় লাগোয়াই রয়েছে জেলা পরিষদের টোল আদায় অফিস। নিয়মিত টোল আদায় করা হয়। অথচ বেহাল রাস্তা মেরামতের বিষয়ে জেলা পরিষদের কোনো উদ্যোগই নেই। ঘটনার দিন উত্তেজিত গ্রামবাসীরা ব্যাপক ভাঙচুর চালান জেলা পরিষদের ওই টোল অফিসে। টোলের সমস্ত কাগজপত্র তছনছ করে দেওয়া হয়। গ্রামবাসীদের আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পেতে ভয়ে টোল ছেড়ে পালিয়ে যান টোল আদায়ের সঙ্গে যুক্ত ২জন কর্মী। এরপরই গোটা টোল আদায়ের অফিসকে ভেঙে তছনছ করে দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, এই ঘটনার পরই শুরু হয়েছে ব্যাপক চাপান উতোর। গ্রামবাসীদের দাবী, প্রায় ২ বছর আগেই এই রাস্তার ওপর থেকে জেলা পরিষদের টোল আদায়ের সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু তারপরেও যথারীতি টোল আদায় করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে টোল আদায় বন্ধ হয়ে গেলেও কিভাবে এতদিন টোল আদায় হয়েছে? কার বা কাদের অনুমতিতে এই টোল আদায় হচ্ছিল? একইসঙ্গে এই টোল আদায়ের টাকাই বা গেল কোথায়? কার্যত এই তিনটি প্রশ্নকে ঘিরেই গ্রামবাসীদের অভিযোগের আঙুল উঠেছে একাধিক তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধেও।


গ্রামবাসীদের অভিযোগ,বেশ কয়েকজন তৃণমূল নেতা এই টোল আদায় অফিস থেকে তোলা নিয়ে গেছেন এতদিন। কিন্তু রাস্তা মেরামতির বিষয়ে তাঁরা ছিলেন সম্পূর্ণ উদাসীন। এদিকে, জানা গেছে, এই টোল আদায় অফিস থেকে চারচাকার গাড়ির জন্য ২০ টাকা, ৬ চাকার গাড়ির জন্য ৮০ টাকা, ১০ চাকার গাড়ির জন্য ১০০ টাকা, ১২ চাকার গাড়ির জন্য ১২০ টাকা হারে আদায় করা হত। সারাদিন ও রাত্রে কয়েকশো গাড়ি যাতায়াত করত এই পথে। ফলে বিপুল পরিমাণেই অর্থ আদায় হয়েছে।

এব্যাপারে পূর্ব বর্ধমান জেলা পরিষদের সহকারী সভাধিপতি দেবু টুডু জানিয়েছেন, মাস খানেক আগেই ওই টোল আদায়কারী সংস্থাকে টোল আদায় বন্ধ করার জন্য তাঁরা নির্দেশ দিয়েছিলেন। সম্প্রতি ওই রাস্তাটি জেলা পরিষদ পূর্ত দপ্তরের হাতে তুলে দিয়েছেন। পূর্ত দপ্তর ইতিমধ্যেই ওই রাস্তার কাজ শুরুও করে দিয়েছে। দেবু টুডু জানিয়েছেন, তাঁরা টোল আদায় বন্ধ করে দেবার নির্দেশ দেবার পরও কারা এই টোল আদায় করেছে তা তাঁরা জানেন না। যেহেতু রাস্তাটি পূর্ত দপ্তরের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে তাই এব্যাপারে যা করার তা পূর্ত দপ্তরকেই করতে হবে।

অন্যদিকে, পূর্ত দপ্তরের এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার ভজন সরকার জানিয়েছেন, সম্প্রতি তাঁরা এই রাস্তার দায়িত্ব পেয়েছেন জেলা পরিষদ থেকে। কিন্তু কোথায় কোথায় টোল আদায় হচ্ছে সে ব্যাপারে তাঁরা কিছু জানেন না। এব্যাপারে তাঁদের লিখিতভাবে কিছু জানানোও হয়নি। যদিও তিনি জানিয়েছে্ন, তাঁরা এই রাস্তার কাজ হাতে নেওয়ার পর ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ইতিমধ্যেই রাস্তা মেরামতির কাজ চলছে দ্রুতগতিতে। পালিতপুর থেকে বীরপুর রেলগেট পর্যন্ত প্রায় ৫ কিমি এই রাস্তার কাজ আগামী কয়েকমাসের মধ্যেই শেষ হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, গ্রামবাসীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে, জেলা পরিষদের নিষেধ সত্ত্বেও খোদ জেলা পরিষদের সিলমোহর দিয়েই দিনের পর দিন টোল আদায়ের নামে তোলাবাজি চালানো হয়েছে অফিসিয়ালি কায়দায়। স্বাভাবিকভাবেই জেলা পরিষদের নাম ব্যবহার করে এই টাকা আদায় করা হলেও আদায়কৃত টাকা জমা পড়েনি জেলা পরিষদের তহবিলে। গ্রামবাসীদের দাবী, এব্যাপারে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত হোক। কারা এই টোল আদায়ের নামে জেলা পরিষদের সীলমোহর ব্যবহার করেছে তা খুঁজে বার করা হোক। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের নামে ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবী উঠেছে। জানা গেছে, বীরভূ্মের একটি সংস্থাকে এই টোল আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কুপনে জেলা পরিষদের সিলমোহর ও অনুমোদনের কথা লেখা রয়েছে। রয়েছে সেখ নাসির নামে টোল আদায়কারীর স্বাক্ষরও। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, জেলা পরিষদ থেকে নিষেধ করার পরও তাঁরা টোল আদায় চালিয়ে যান – যে অর্থ জেলা পরিষদের তহবিলে জমা পড়েনি। পরিবর্তে সেই অর্থ গেছে বেশ কয়েকজন তৃণমূল নেতার পকেটে। এদিকে টোল কেলেঙ্কারির বিষয়টি জনসমক্ষে আসতেই নড়েচড়ে বসেছে শাসক দলের নেতৃবৃন্দ।
পূর্ব বর্ধমান জেলা পরিষদের সিলমোহর ব্যবহার করে মেয়াদ উর্তীর্ণ টোল চালানোর অভিযোগ, আলোড়ন
  • Blogger Comments
  • Facebook Comments

0 comments:

Post a Comment

Top